হাইউল উদ্দিন খান,গাজীপুর প্রতিনিধি:
সাংবাদিক শরীফ ওমর টুটুলের ওপর নৃশংস হামলার ৫ দিন পেরিয়ে গেলেও মামলার প্রধান আসামিদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় ক্ষোভে ফুঁসছেন গাজীপুরের সাংবাদিকরা।
হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে এবার রাজপথে নেমেছেন জেলার বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা। মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে তারা স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন—আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা না হলে গাজীপুরের সাংবাদিক সমাজ বৃহত্তর আন্দোলনে যাবে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকাল ১১টায় গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি) সদর দপ্তরের সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে এ হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। কর্মসূচি শেষে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দেন সাংবাদিক নেতারা।
হামলার শিকার শরীফ ওমর টুটুল গাছা থানা প্রেসক্লাবের দপ্তর সম্পাদক ও দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৩ আগস্ট। মানববন্ধনে বক্তাদের অভিযোগ, ওই দিন গাজীপুর মহানগরের গাছা এলাকায় ‘ইন্ডোসর’ নামে একটি পোশাক কারখানার সামনে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দেশীয় অস্ত্রের মহড়া চলছিল। এতে হামিদ মন্ডল ও তার ছেলে যুবলীগ নেতা সোহেলের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ করেন তারা।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহ ও অস্ত্রের মহড়ার ভিডিও ধারণ করতে যান সাংবাদিক টুটুল। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় তার ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। তার মোবাইল ফোন ভাঙচুরের পাশাপাশি রামদা দিয়ে মাথায় কোপ দেওয়া হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় টুটুলকে উদ্ধার করে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এ ঘটনায় গাছা মেট্রো থানায় মামলা করা হলেও ঘটনার ৫দিন পরও প্রধান আসামি হামিদ মন্ডল, তার ছেলে সোহেলসহ মামলার নয়জন নামীয় আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় মানববন্ধনে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাংবাদিক নেতারা।
গাজীপুর সাংবাদিক ইউনিটির সভাপতি ও দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের বিশেষ প্রতিনিধি মো. আখতার হোসেন বলেন, “ঝুট ব্যবসা হামিদ মন্ডল গ্রুপ করুক, সমস্যা নেই। তার ছেলে যুবলীগ করে, সেটাতেও সমস্যা নেই। কিন্তু দিনদুপুরে ঝুট নিয়ন্ত্রণে অস্ত্রের মহড়া দেবেন, সেই ঘটনার নিউজ কভার করতে গেলে সাংবাদিকের মোবাইল ভাঙবেন, সাংবাদিককে কোপাবেন—এটা সাংবাদিক সমাজ মেনে নেবে না।”
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “দ্রুত জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। মামলার আসামিদের যদি কেউ আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়, তাদের রক্ষায় কোনো গডফাদার বা অন্য কেউ মদদ দেয়, আমরা তাদের মুখোশ খুলে দেব। তাদেরকে জাতির সামনে তুলে ধরব।”
বক্তারা বলেন, একজন সংবাদকর্মীর ওপর হামলা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর হামলা নয়; এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের অপচেষ্টা। সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি, অপরাধ ও অসঙ্গতি মানুষের সামনে তুলে ধরাই সাংবাদিকের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সংবাদকর্মীকে হামলা, হুমকি কিংবা হয়রানির শিকার হতে হলে তা মেনে নেওয়া হবে না।
তারা বলেন, “সাংবাদিকের ওপর হামলা করে সত্য প্রকাশের পথ বন্ধ করা যাবে না। টুটুলের ওপর হামলায় জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।”
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত পিতা-পুত্রের রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোহেল আওয়ামী যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তাঁর বাবা হামিদ মন্ডল বর্তমানে বিএনপির ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি।
কোনো রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব ব্যবহার করে মামলার আসামিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় বা রক্ষার চেষ্টা করা হলে সাংবাদিক সমাজ তা প্রকাশ্যে তুলে ধরবে বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়।
বক্তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি প্রশ্ন রেখে বলেন, প্রকাশ্য দিবালোকে একজন সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হওয়ার পরও পাঁচ দিনে কেন প্রধান আসামিরা গ্রেপ্তার হয়নি। দ্রুত দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
মানববন্ধন থেকে সাংবাদিক নেতারা বলেন, দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করা না হলে বর্তমান প্রতিবাদ কর্মসূচি আরও বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেবে। গাজীপুরের সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধভাবে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। একই সঙ্গে গাজীপুরে কর্মরত সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন গাছা থানা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. সোহেল মিয়া, সিনিয়র সহসভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ প্রেসক্লাব গাজীপুর মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল বারী, গাছা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মো. আরিফ মৃধা, গাছা সাংবাদিক ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আরিফ হোসেন, সভাপতি মো. সামসুদ্দিন জুয়েল, ঢাকা প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ছানাউল্ল্যাহ ভূইয়া, গাজীপুর জেলা সাংবাদিক ঐক্য পরিষদের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক মো. পারভেজ মিয়া এবং গাজীপুর সিটি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. মনির হোসেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও গাজীপুর মহানগর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এম আক্তারুজ্জামান, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি গাজীপুর মহানগরের সদস্য সচিব হাসান মিয়া, গাজীপুর সাংবাদিক ইউনিটির সভাপতি ও দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের বিশেষ প্রতিনিধি মো. আক্তার হোসেন, বাসন মেট্রো থানা প্রেসক্লাবের সভাপতি সাজ্জাকুল ইসলাম রাজ্জাক এবং বাংলাদেশ মহিলা প্রেসক্লাবের সভাপতি নাসিমা আক্তার রেনুসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন। কর্মসূচিতে গাজীপুরের বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ শেষে সাংবাদিক নেতারা গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এবং গাজীপুর জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দেন।
স্মারকলিপিতে সাংবাদিক শরীফ ওমর টুটুলের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার, ঘটনার সুষ্ঠু ত